রবিবার, ২৩শে জুন, ২০২৪

সর্বশেষ

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস, ‘নিখোঁজ’ স্বজনের অপেক্ষায় এখনো পরিবার 

গত কয়েক বছরে ৬ শতাধিক মানুষকে ‘গুম’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও তাদের এ তালিকায় আছেন জনপ্রতিনিধি, তরুণ-যুবক, ছাত্র, সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী।চট্টগ্রামের বোয়ালখালিতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান বাচা,ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম এখনো নিখোঁজ।
এর মধ্যে কাউকে কাউকে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার অনেক পরে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীর্ঘদিন পর ফেরত এসেছেন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি। আর শতাধিক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে বলে বিএনপির দাবি। বাকিদের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েই তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে বলে ‘গুমের শিকার’ ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি।

বিএনপির ‘নিখোঁজ’ কর্মী সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি বলেন, ‘তার ভাইকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র্যাবের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। তারপর গত প্রায় নয় বছর ধরে কোনো খোঁজ নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে পুলিশ, র্যাব, ডিজিএফআই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব জায়গায় গিয়ে লিখিতভাবে জানতে চেয়েছি—আমার ভাই কোথায়? কেন তাকে আটকে রাখা হয়েছে? কিন্তু কোনো সদুত্তর এখনো নেই। আমরা এখনো আশায় আছি, আমার ভাই পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। হয়তো তাকে কোথাও আটকে রাখা হয়েছে।’

২০১১ সালের ৮ মে বিকেলে ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ হন ছাত্রদল নেতা মনির হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর। নিখোঁজের ৪ দিন পর মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি ছেলের কোনো সন্ধ্যান পাননি হানিফ মিয়া। গতকাল তার সঙ্গে কথা বললে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বহু খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের কোনো সন্ধান পাইনি। দুঃখের কথা কার কাছে বলব? কেউ শুনলে হয়তো সান্ত্বনা দেবে; কিন্তু ছেলেকে তো আর দিতে পারে না। তিনি বলেন, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে তার মা স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন অসুস্থ (অবশ) হয়ে বাড়িতেই আছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তারা কোনো ফল পাননি। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েই কাটছে তাদের সময়। ছেলে কিংবা স্বামীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থেকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন অনেকেই। বছরের পর বছর পেরোলেও সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না অনেকের। স্বজনের বুকে হাহাকার চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘ ২০০২ থেকে কাজ শুরু করে ২০০৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়ন করে। ইংরেজিতে নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে এই আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়। তাতে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম-প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

দলের নেতাকর্মীদের গুমের অভিযোগ তুলে বিএনপি বেশ কয়েক বছর ধরেই দিবসটি পালন করে আসছে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে এই ইস্যুটিকে সামনে রাখতে তৎপর রয়েছে দলটি। বিশেষ করে সরকারকে চাপে রাখতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুমের ইস্যুটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা রয়েছে তাদের। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সারা দেশে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন করবে বিএনপি।

জানা গেছে, সারা দেশে গুম, খুন, অপহরণ ও গুরুতর জখমের শিকার নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করছে বিএনপি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে মহানগর, জেলা, উপজেলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কতজন নেতাকর্মী ও সমর্থক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ারে’, নির্যাতনে বা অন্য কোনোভাবে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন; কতজন অপহরণ, ‘গুম’ হয়েছেন; সরকারি দলের হামলায় কতজন খুন-জখম হয়েছেন—তাদের দলীয় পরিচয়সহ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর।

জানা যায়, গুম-অপহরণের তথ্য সংগ্রহের পর সেগুলো সমন্বিতভাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে তুলে ধরবে বিএনপি। মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে বহির্বিশ্বের কাছে গুমের বিষয়টিকে ফোকাসের চেষ্টা করছে দলটি।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গুমের মতো ঘটনা মানবতার শত্রুদের দ্বারাই সম্ভব। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই ক্ষমতাসীনরা এদেশে গুমের সংস্কৃতি চালু করেছে। এক্ষেত্রে তারা আর কতদূর অগ্রসর হবেন সেটি নিয়ে গোটা জাতি শঙ্কিত।’

অবশ্য এসব বিষয়ে বিএনপির তৎপরতাকে আওয়ামী লীগ ‘বিদেশিদের কাছে নালিশ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই ইস্যু সামনে এনে বিএনপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে বলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অভিযোগ।

অন্যদিকে ‘গুম’ বা ‘নিখোঁজ’ ইস্যুতে বিদেশিদেরও আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গুমের শিকার ব্যক্তিদের বাসায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন। ২০২২ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তিনি স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশে গুম, খুন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জেরে সাংবাদিক হয়রানি নিয়ে তার উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলেন। এমনকি ফিরে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেও তিনি এসব বিষয়ে উদ্বেগের কথা বলেন।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনীতিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যুতে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংস্থার প্রধানের সঙ্গে দেখা করে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি বিবৃতিও দিয়েছেন।

 

আরও পড়ুন