শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ

ফিলিস্তিন ইস্যুতে জেগে উঠছে বিশ্ব?

সাধারণভাবে বলা হয়, দুঃখের পর সুখ আসে। অশান্তির পর শান্তি আসে। ফিলিস্তিনি জনগণ বিগত ৭৫ বছর সেই শান্তির মুখ দেখেনি। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সমরাস্ত্র ও সুদক্ষ সেনাবাহিনী রয়েছে ইসরাইলের। সেই সেনাবাহিনীর বিপক্ষে ফিলিস্তিনিরা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে ৭৫ বছর ধরে লড়াই করে চলেছে। তাদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য লড়াই করছে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত। বিগত ৭৫ বছরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভূমি দখল করতে করতে তাদের শুধু গাজা ও পশ্চিম তীর এ দুটি ভূখণ্ডটুকুই অবশিষ্ট আছে, জেরুসালেমসহ বাকি পুরো অঞ্চল ইসরাইল ইতোমধ্যেই দখল করে নিয়েছে।

উনিশ শতকের প্রথমদিকে যখন ইহুদি দখলদারত্ব শুরু হয়নি তখন এ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ ছিল মুসলিম, আর এক-তৃতীয়াংশ ইহুদি। তখন তেমন কোনো যুদ্ধ তাদের মাঝে হয়নি। সমস্যা তৈরি হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ ‘কৃত্রিম ফসফরাস’ তৈরি করতে সক্ষম হন বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। তিনি ধর্মে ছিলেন ইহুদি। এ আবিষ্কারের ফলে আনন্দিত হয়ে তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন তিনি কী পুরস্কার চান। ড. হেইমেন কোনো অর্থকড়ি চাননি। চেয়েছিলেন তার স্বজাতির (ইহুদি) জন্য একটুকরো ভূমি। সেই ভূমি দুনিয়ার আর কোথাও নয়, দিতে হবে ফিলিস্তিনে। ফলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় গ্রেট ব্রিটেন। ১৯২০ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে (লিগ অফ নেশন্স) এক ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশরা ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইন ঘোষণা করে। এ ঘোষণার পর থেকে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকারে প্রায় ৩০ বছর দেশটি দখল করে নিজেদের অধীনে রাখে ব্রিটিশরা। এ ব্রিটিশ কর্তৃত্ব চলাকালে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে জড়ো হতে থাকে। সে অঞ্চলে বাড়তে থাকে তাদের সংখ্যা। এরপর ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা ১ মিনিটে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করে ইহুদি জায়নবাদীরা। মাত্র ১০ মিনিটের ভেতর ইসরাইলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপর স্বীকৃতি দেয় ব্রিটেন এবং তৎকালীন সময়ের আরেক পরাক্রমশালী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন। আমেরিকা ও ব্রিটেনের সহযোগিতা ও আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ইহুদিরা নিজেদের সেনাবাহিনী গঠন করে। মুসলিম ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও অত্যাচার করে তাদের ভূমি দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। অবৈধ দখলদারত্ব এবং নিরীহ ফিলিস্তিনিদের অত্যাচার করে বস্তুচ্যুত করার ফলে সে অঞ্চলে মুসলমান ও ইহুদিদের মাঝে অশান্তি তৈরি হয়। যে অশান্তির আগুন এখনো জ্বলছে। ছড়িয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্বে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। নিজেদের ভূখণ্ড শত্রুমুক্ত করেছে। সে সময় আমাদের এক কোটি মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে ট্রেনিং ক্যাম্প করে, প্রস্তুতি নিয়ে, আবার শত্রুর মোকাবিলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু গাজা ভূখণ্ডের চারপাশে ইসরাইলের বর্ডার, অন্য পাশে সাগর। শুধু একদিকে মিসরের বর্ডার আছে। সেই বর্ডার তারা বন্ধ করে দিয়েছে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পরপর। ফলে গাজার সাধারণ জনগণ পালিয়ে কোথাও আশ্রয় নেবে, সে পথও তাদের বন্ধ হয়ে আছে। গাজাকে মনে করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগার। প্রকৃতপক্ষে, গাজাবাসী কারাগারের চেয়ে বেশি নির্যাতন আর জুলুমের শিকার হচ্ছে। কয়েদিরা তাদের মেয়াদ শেষে কারাগার থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু গাজাবাসীর কপালে সেই মুক্তি কবে আসবে তার কোনো মেয়াদ নেই।

শত হতাশার মাঝেও আশার কথা হলো, ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুদ্ধ বন্ধে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের যে সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। মানুষ জেগে উঠেছে, যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে দেশে দেশে বিক্ষোভ চলছে। গোটা দুনিয়ার মানুষ শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে। বিশ্ববাসী বুঝতে পারছে, ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে যে হত্যাযজ্ঞ ও সহিংসতা চালানো হয়েছে তাতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য এখন একান্ত প্রয়োজন। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের ভেটো প্রদানের ফলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ হচ্ছে না, কার্যকর হচ্ছে না। অবশ্য ঘরে-বাইরে চাপের কারণে বাইডেন প্রশাসন কিছুটা নমনীয় হয়েছে। তবে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আরব নেতারা যদি নিজ নিজ দেশের জনগণের সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ হন-তাহলেই ফিলিস্তিন জনগণের মুক্তির একটি উপায় বের হয়। ইতোমধ্যে ক্রাউন প্রিন্স বা সৌদি বাদশাহ এ ইস্যুতে রাজধানী রিয়াদে শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আরব নেতারা ইসরাইলকে নিবৃত করতে সক্ষম হবেন কিনা? আরব নেতারা সদিচ্ছাসহ সেটা চাইবেন কিনা? তারা আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবেন কিনা? যুদ্ধ বা অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি উক্তি এখানে মনে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু জুলিও কুরি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবন দর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী মানুষ যে কোনো স্থানেই হোক না কেন, আমি তাদের সঙ্গে আছি।’ তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সেই অর্থ দুনিয়ার দুঃখী মানুষের কল্যাণে ব্যয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আরব নেতাদেরও সমস্বরে বলতে হবে, ‘ইসরাইল, রক্তের হোলিখেলা বন্ধ করো। করতে হবে।’

কিছুদিন আগেই পত্রিকায় পড়ছিলাম, ২০১৪ সালে ফিলিস্তিন নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার পর আল জাজিরার একজন সাংবাদিকের হাতে কিছু ছবি এসেছিল। ছবিগুলো এঁকেছিল ইসরাইলের সীমান্তবর্তী খান ইউনিস এলাকার খুজা শহরের শিশুরা। ছবিগুলোর দিকে প্রথমে তাকালে সেগুলোকে বাচ্চাদের আঁকা সাধারণ সুন্দর ছবিই মনে হবে। বিভিন্ন রঙের বাড়ি, বাড়ির পাশে ঘাসে ভরা মাঠ, আকাশে মেঘ, সূর্য। কিন্তু ছবিগুলোর দিকে একটু খেয়াল করেই সেই সাংবাদিক চমকে উঠলেন। সেসব মেঘ, সূর্য, বাড়িঘরের পাশাপাশি প্রতিটি ছবিতে মিসাইল, ট্যাংক, বুলডোজার ও যুদ্ধবিমানের মতো যুদ্ধের সারঞ্জাম আছে। আর সেই যুদ্ধ সরঞ্জামের লক্ষ্য সেই বাড়িঘর। সেই এলাকার একজন শিশু কতটা মানসিক আতঙ্ক, যন্ত্রণা এবং ট্রমা নিয়ে বেড়ে ওঠে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ ওই ছবিগুলো। হামাস-ইসরাইল যুদ্ধের ফলে যে ছবিগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে, তাতে আমাদেরও কি সেই মানসিক আতঙ্ক ও যন্ত্রণায় জড়িয়ে ফেলছে না? এমন দিন কি সত্যিই কোনোদিন আসবে, যেদিন ফিলিস্তিনি শিশুর ড্রয়িং খাতায় গাছপালা, পশু-পাখির মাঝে মিসাইল, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি থাকবে না। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা কি কখনো পূরণ হবে?

তৌহিদুল হাসান নিটোল : সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন