মঙ্গলবার, ৫ই মার্চ, ২০২৪

সর্বশেষ

 ঐতিহ্যবাহী ‘চন্দনপুরা মসজিদ’

স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত চট্টগ্রামের অতি প্রাচীন চন্দনপুরা মসজিদ। নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কে এটি অবস্থিত। মসজিদের চারদিকে যেন রঙের মেলা। হরেক রঙ ব্যবহার করা হয়েছে স্থাপনার প্রতিটি অংশে। লতা-পাতার নকশা আর নানান কারুকাজে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুনিপুণ হাতে। অনেক দূর থেকে দেখা যায় মসজিদটির বাহ্যিক সৌন্দর্য।
চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কের চন্দনপুরা সড়কের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পশ্চিম পাশে চোখে পড়বে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। কারুকাজ দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এটি মোগল স্থাপিত্যশৈলীর আদলে তৈরি।অনেকের কাছে এই মসজিদ চন্দনপুরা বড় মসজিদ বা তারা মসজিদ নামেও পরিচিত। এখন মসজিদটির বয়স ১৪৯ বছর।

চারিদিকে যেন রঙের মেলা। লাল, সবুজ, নীল, হলুদ, সাদা, গোলাপীসহ হরেক রঙ ব্যবহার করা হয়েছে স্থাপনার প্রতিটি অংশে। লতা-পাতার নকশা আর নানান কারুকাজে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুনিপুণ হাতে। অনেক দূর থেকে দেখা যায় মসজিদটির বাহ্যিক সৌন্দর্য।

চারপাশের দেওয়ালগুলো ভেন্টিলেশন সিস্টেমের। দেওয়ালের ফাঁক গলে ঢুকছে আলো। আলোর ঝরনাধারায় ভেতরটা করছে ঝলমল, আছে বাতাসের কোমল পরশ।
চন্দনপুরা সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে মোগল স্থাপনা শিল্পের আদলে ১৮৭০ সালে মাটি ও চুন সুরকির দেওয়াল আর টিনের ছাদের মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুল হামিদ মাস্টার। তখনও মাটির দেওয়ালে কারুকাজে ভরপুর ছিল। তার বংশধর বৃটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৪৬ সালে এই মসজিদের সংস্কার কাজে হাতে দেন। এতে সেই সময়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকারও অধিক খরচ হয়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মসজিদের সুউচ্চ মিনার, দেওয়াল, দরজা-জানালা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ছিল দৃষ্টিনন্দন সূক্ষ্ম কারুকাজ। আবু সৈয়দ দোভাষ একই নকশায় নগরের কোতোয়ালীর মোড় এলাকায় শ্বশুর বাড়িতেও একটি মসজিদ তৈরি করেছিলেন। তবে সেটি এই মসজিদ থেকে আকারে ছোট ছিল।

চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে মসজিদটির ছবি ব্যবহার করা হয় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায়। প্রকাশনাগুলোতে এ মসজিদের ছবি থাকায় বিদেশ থেকে পর্যটকরাও আসেন এখানে।

আবু সৈয়দ দোভাষ সেই সময়ে কলকাতা থেকে কারিগর ও দিল্লীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে উপকরণ এনে প্রায় ১৩শতক জায়গার ওপর দোতলা মসজিদটি গড়ে তুলেন।

মসজিদে রয়েছে ছোট-বড় ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে যাওয়ার জন্য আছে সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়িতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোগল স্থাপত্য নিদর্শনের প্রতিচ্ছবি। গম্বুজের চারপাশে রয়েছে আহলে বায়তে রাসূল সহ দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ জন সাহাবির নাম। যখন মাইকের ব্যবহার ছিল না, তখন চারতলা সমান উঁচু মিনারে উঠে আজান দেওয়া হতো। এ রকম দুইটি মিনার এখনও আছে।

মসজিদের মোতাওয়াল্লি পরিবারের সদস্য মো. জহুরুল হক বলেন, তার দাদা আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৫০ সালে এ মসজিদ পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ করেন। এখন প্রতি ৫ বছর পর একবার রঙ করা হয়। একবার রঙ করার কাজ শেষ করতে প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগে। এ মসজিদে বড় গম্বুজটি ছিল প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতলের তৈরি। রুপা-পিতলের প্রাচীন অনেক কারুকাজ ছিল।

এই সূক্ষ্ম কাজের কারিগরের অভাবে সংস্কার কাজও সঠিকভাবে করা যায় না। বৈরি আবহাওয়ায় এসব জিনিস যেমন নষ্ট হয়েছে তেমনি সংস্কারের সময়ও অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। এখন আমরা বড় গম্বুজে সবুজ, গোলাপি ও হলুদ রঙ করে দিই। তিনি জানান, বর্তমানে মসজিদে একজন ইমাম, একজন হাফেজ ও দুইজন মুয়াজ্জিন রয়েছেন।

মসজিদের মুয়াজ্জিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের খেদমত করছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ এ মসজিদ দেখতে আসেন। আশপাশেও অনেক নতুন মসজিদ গড়ে উঠেছে। তারপরও এই মসজিদের মুসল্লির সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।

তিনি বলেন, সাধারণত দিনে গড়ে ৮ থেকে ৯ শত লোক নামাজ পড়েন এই মসজিদে। শুক্রবার তা হাজার তিনেক ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদে জায়গা সংকুলান না হলে রাস্তা বন্ধ করে সেখানেই নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা।

কবি কায়কোবাদ লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা ‘আযান’। সেটারই প্রতিধ্বনি করলেন এই মসজিদে আসা মুসল্লি নেজাম উদ্দীন। আবৃত্তি করলেন: ‘কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি। মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর, আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী। কি মধুর আযানের ধ্বনি! আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে, কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে, কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে’।

আরও পড়ুন