শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সর্বশেষ

কী হচ্ছে বা কী হবে জবাব নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাছে

কূটনৈতিক উইংয়ের ওপর ক্ষুব্ধ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক আগের পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের পর্যালোচনা কী, নির্বাচন উপলক্ষে তাদের কর্মকা- কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বিশেষ করে দুই প্রভাবশালী দেশ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন কোন মেরুতে রয়েছে, সে সম্পর্কে অন্ধকারে সংশ্লিষ্টরা। ফলে সারা দেশের নেতাকর্মীদের কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা পৌঁছাতে পারছে না বিএনপি নেতৃত্ব। এ কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা; তাদের চোখে-মুখে নির্বাক জিজ্ঞাসা।

বিএনপির আন্তর্জাতিক উইং ঠিকভাবে কাজ করছে না এমন অভিযোগ আগেও ছিল। নির্র্বাচন ঠেকানোর এক দফার আন্দোলনে নামার আগে যে ‘হোমওয়ার্ক’ দরকার তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল দলটির একাংশের নেতাদের মধ্যে। তখনই বলা হয়েছিল, গ্রেপ্তার, হামলা-মামলায় পড়লে করণীয় বিষয়ে বিদেশিদের কে বোঝাবে? যেভাবে তারা এগোচ্ছে তাতে যে পরিপক্বতার ছাপ নেই বা তাদের তৎপরতা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, সেটি খোলাসা হচ্ছে দিনে দিনে।

তৃণমূল নেতাদের ভাষ্য : হাওয়ায় ভাসছে বিএনপির কূটনৈতিক উইং। দলটির একাধিক নেতা এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চেয়েছেন এবং চান, ‘কোনো খবর আছে কি?’ দেশব্যাপী তৃণমূলের অন্তত ১০ জন নেতার প্রশ্ন ‘ফরেন উইং কতটা কাজ করছে? ভারতের মনোভাব পরিবর্র্তন করতে পেরেছে কি? ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র স্যাংশন দেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জন ছিল, সেটা হলো না কেন?’

গত সপ্তাহে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে সভায় প্রথা ভেঙে আন্তর্জাতিক বিষয়াদির দেখভাল করেন, প্রকাশ্য মঞ্চে কথাবার্তা বলেন এমন একজন নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত রাখা হয়েছিল। তার কাছে শীর্ষ নেতাদের জিজ্ঞাসা ছিল, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশিদের মনোভাব কী? আন্দোলনে যাওয়ার আগে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়গুলো কেন পরিষ্কার হচ্ছে না?’ এসব প্রশ্নের জবাব ওই নেত্রী দিতে পারেননি। ক্ষুব্ধ নেতারা তখন অনেকটা ভর্ৎসনার সুরে তাকে আরও সক্রিয় হতে বলেন।

ফরেন রিলেশন কমিটির (এফআরসি) এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ওই বৈঠকের পর কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বলেছেন শীর্ষ নেতারা। তবে আপাতত করণীয় বিষয়ে বিদেশিদের কাছ থেকে নতুন বার্তা আসতে পারে বলে আশ্বস্ত হতে পারেনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। বিএনপি নিশ্চিত হয়েছে, বহির্বিশ্বের কাছ থেকে নির্বাচন ঠেকানোর মতো চাপ আসার সম্ভাবনা আপাতত নেই।

কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে ২১ সদস্যের ফরেন রিলেশন কমিটি (এফআরসি) গঠন করেছিল বিএনপি। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অন্য নেতারা। দলটির বেশিরভাগ শীর্ষ নেতাই এখন কারাগারে বা আত্মগোপনে।

বিশেষ করে মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর পঙ্গুবৎ এফআরসি। যদিও আমীর খসরু ও তার তোষকদের নিয়ে আগেও প্রশ্ন ছিল বিএনপির বেশ কিছু নেতার মধ্যে। তার পরও যতটুকু কাজ চলছিল সেটিও এখন বন্ধ প্রায়। খুঁড়িয়ে পথ চলতে গিয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিদেশিদের চাপের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতায় বিএনপির চেইন অব কমান্ড নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। এর প্রভাবে হতাশা তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে।

বিএনপি নেতাদের ধারণা ছিল, বিরোধী দলগুলোর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবির চলমান আন্দোলনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে আন্তর্জাতিক মহলে। তাদের এ ধারণার কারণ, নির্বাচন নিয়ে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাবিশ্ব। কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছিল। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যাহতকারী ব্যক্তিদের ওপর ভিসানীতি প্রয়োগেরও ঘোষণা দিয়েছিল দেশটি।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘেরও নির্বাচন নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য-বিবৃতি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের আপাত নীরবতা বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তবে আশা ছাড়েননি বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন শ্রমনীতি ঘোষণা করেছে। তাতে বাংলাদেশ আক্রান্ত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপাত নীরবতা বড় আঘাতের পূর্বাভাসও হতে পারে।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড না থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছে বিএনপি। চিঠিতে দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন, সভা-সমাবেশে বাধা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হামলা-মামলার তথ্য-উপাত্ত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হচ্ছে সেসব চিঠিতে।

২৮ অক্টোবর থেকে এ পর্র্যন্ত বিএনপির ১৯ নেতা ও কারাগারে ৫ নেতার মৃত্যুর তথ্য গত সপ্তাহে বিভিন্ন দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। আমীর খসরুর গ্রেপ্তারের পর তাকে এফআরসির দায়িত্বে আনা হয়। গত দেড় মাসে তিনি অন্তত ছয়টি বৈঠক করেছেন। তাকে ঘিরেই এখন বিএনপির বৈদেশিক উইংয়ের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

ড. আবদুল মঈন খান ২ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব নির্বাচন নিয়ে আস্থাহীনতার প্রশ্ন তুলেছে। তারা যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিল, সরকার তা আমলেই নেয়নি। বিদেশিরা সরকারের কর্মকা-ে নাখোশ।’

তিনি বলেন, অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ দেশের জনগণের কোনো আন্দোলন বৃথা যায়নি। এবারও যাবে না। এখন ২০১৪ সালও নয়, ২০১৮ সালও নয়।

সময়ের আলো থেকে সংগৃহীত

আরও পড়ুন